ডিজিটাল ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করতে হবে

Date: 2026-02-23
news-banner

॥ এস.এম. জহিরুল ইসলাম ॥

ভিক্ষাবৃত্তি আমাদের সমাজে ছিল কালের পর কাল। কারণ সমাজে যেমন ধনী মানুষ থাকে তেমনী নানা কারণে মানুষ গরীবও হয়ে যায়। দুর্যোগ, মহামারী, নদী ভাঙ্গনসহ নানা অনুকূল পরিবেশের কারণে মানুষ দরিদ্র হয়ে যায়। একজন মানুষ যখন সব হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পরে এবং তার বেঁচে থাকার আর কোন সম্বল থাকে না তখন তিনি প্রথম নিজের পরিচিতজন, নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে ধার দেনা করে চলতে থাকে। এক পর্যায়ে যখন নিজেদের জন্য আর সহযোগীতা নেয়ার কেউ থাকে না, তখন ভুক্তভোগী মানুষটি বেছে নেয় ভিক্ষাবৃত্তির পথ। লোক লজ্জার ভয়ে প্রথমে দুরে গিয়ে শুরু করলেও ধীরে ধীরে সে হয়ে যায় পরিচিত একজন ভিক্ষুক। জীবনে স্বার্থক ও সফল মানুষটিও পেশা হয় ভিক্ষাবৃত্তি।

আমাদের দেশে গণপরিবহন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সামনে হাটবাজারে অসহায় মানুষকে ভিক্ষাবৃত্তিও করতে দেখা যায়। নগর মহানগরের প্রতিটি অলিগলিতে এখন ভিক্ষুকের যেন মিছিল নামে। এতে বুঝা যায়, দেশের মানুষ ভাল নেই। ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলিতে ভিক্ষুকদের জন্য রাস্তায় দাড়িয়ে একজন চালাতেও সাধারণ মানুষের কষ্ট হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী জানা যায়, কেউ কেউ ভিক্ষুকদের নিয়ে রমরমা ব্যবসা করে। ঢাকার বস্তিতে ঘর ভাড়া নিয়ে উত্তরাঞ্চল থেকে শর্ত মোতাবেক ভিক্ষুক ভাড়ায় এনে কমিশন ভিক্ষা করায়। ভিক্ষা করে পাওয়া বড় অংশ টাকা চলে যায় কথিত ঐ ভিক্ষুক ঠিকাদারের পকেটে আর সামান্যই পায় ভিক্ষুক। এই চিত্র বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসিজদসহ দেশের বিখ্যাত মসজিদ ও মাজারগুলোতে হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে। বিভিন্ন মাজারেও নানা বেশে ভিক্ষুকদের দেখা মিলে। তারা কর্মক্ষম থাকলেও নানা অজুহাতে ও বিভিন্ন কাজে ভিক্ষাবৃত্তি করে থাকে। বর্তমান সময়ে আবার বের হয়েছে ডিজিটাল ভিক্ষাবৃত্তি। নিজেকে অসুস্থ পরিচয়ে ভ্যানগাড়ী, রিকসা বা রাস্তার পাশ্বে ভিক্ষা করার বিভিন্ন স্লোগানে রেকর্ড করে তা বানিয়ে ভিক্ষা করে থাকে।

মসজিদে নামাজের সময়ও এই ডিজিটাল ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ হয় না, সব পরিবেশে পরিস্থিতিতে তাদের ভিক্ষার রেকর্ড জোরে জোরে সাউন্ড দিয়ে চলতেই থাকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশ দিয়ে বা সামনে এই ভিক্ষার রেকর্ড বাজার কারণে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট ও বিঘ্নিত হয়।

 হোটেল রেস্তোরা, খাবারের দোকান ও জনবহুল এলাকাগুলো বেঁছে নেয় ভিক্ষুকরা। বেশীরভাগ মানুষই ক্ষুদার জ্বালা মেটাতে ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নেয়। কেউ কেউ চিকিৎসার সহায়তার জন্যও মানুষের কাছে হাত পাতে। বর্তমানে বিভিন্ন মসজিদ মাদ্রাসাসহ রাস্তায় ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন হাতে অনেকে চিকিৎসার জন্য সাহায্য পেতে দেখা যায়।

এ ছাড়াও ছেলে মেয়ের বিবাহ, লাশ দাফন, মসজিদ, মাদ্রাসার উন্নয়নের নামে নানা পদ্ধতিতে অনেককে কৌশলে ভিক্ষাবৃত্তি করতে দেখা যায়। পূর্বে দেখা যেত অভাবী মানুষগুলো গোপনে শব্দহীনভাবে নিজের পেটের ক্ষুধা মেটাতে ভিক্ষাবৃত্তি করত। এখন অচল, পংগু, রোগা ও অসুস্থ মানুষ ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন চালাতে দেখা গেলেও এখন তার বিভন্নরূপে। এখন সবল ও সুস্থ মানুষকেও ভিক্ষা করতে দেখা যায়। শরীরে কাজ করার শক্তি সামর্থ আছে এমন মানুষকে এখন রাস্তাঘাট, হাট বাজার বিশেষ করে মসজিদের সামনে ভিক্ষা করতে দেখা যায়।

 অনেকের কাছে ভিক্ষ এখন বিনা কষ্টে আয়ের পথ। সরকারের সমাজসেবা মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে এই ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার বলে সুধীজন মনে করেন। সরকার ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের মুখে সমাজ উন্নয়নের নানা বক্তব্য আসলেও একটি দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে কোন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায় না। দারিদ্রতা আমাদের সমাজে থেকেই যায়। সরকারের নানা প্রতিষ্ঠান থাকলেও ভবঘুরে, ছিন্নমূল মানুষ দেশে দিন দিন বেড়েই চলছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও দানশীল ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক- এস এম জহিরুল ইসলাম, চেয়ারম্যান, রুর‌্যাল জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশন (আরজেএফ)

Leave Your Comments

Trending News