ব্রির শ্রমিক কলোনির পুকুর নিয়ে লিজ ও মাছ ধরার টিকিট বাণিজ্যের অভিযোগ
Date: 2026-11-01
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) শ্রমিক কলোনিতে অবস্থিত একটি সরকারি পুকুরকে ঘিরে মাছ চাষ, পুকুর লিজ, বড়শি দিয়ে মাছ ধরার টিকিট বিক্রি এবং অর্থের হিসাব নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গবেষণার কাজে পানি সংরক্ষণ ও মাছ চাষের জন্য নির্ধারিত পুকুরটি যথাযথ সরকারি নিয়ম অনুসরণ না করে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
খামারের নথিতে সংরক্ষিত অফিস আদেশ অনুযায়ী, পুকুরটি মাছ চাষ ও গবেষণার পানি সংরক্ষণের কাজে ব্যবহারের কথা। মাছ চাষের পর উৎপাদিত মাছ শ্রমিকদের মধ্যে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করার নির্দেশনা রয়েছে বলেও জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, পুকুরটি কোনো অবস্থাতেই লিজ বা টিকিটের মাধ্যমে মাছ ধরার জন্য ব্যবহারের অনুমতি নেই। মাছ বিক্রির অর্থ নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ক্লাবের ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার বিধানও রয়েছে।
কিন্তু এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করে পুকুরটি প্রায় দুই লাখ টাকায় লিজ দেওয়া হয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি। সম্প্রতি (৩১/১০/২০২৬) পুকুরে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার জন্য জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এ অর্থ গ্রহণ, কোন খাতে জমা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অতীতেও পুকুর লিজ নিয়ে চাকরি হারানোর ঘটনা
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০০৯ সালে পুকুর লিজ দেওয়াকে কেন্দ্র করে ব্রির ১০ জন শ্রমিকের চাকরি চলে গিয়েছিল। বর্তমানে ওই ঘটনার প্রকৃত কারণ ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ভিন্ন বক্তব্য সামনে আসছে। সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের দাবি, তাঁদের চাকরি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গেছে বলে প্রচার করা হলেও পুকুর লিজসংক্রান্ত বিষয়টি ছিল আসল ঘটনা। বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
শ্রমিক নেতা ও কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
পুকুরটির ব্যবস্থাপনা ও মাছ ধরার সুযোগ দেওয়ার ঘটনায় ব্রির শ্রমিক নেতা মো: আলমগীর হোসেন, যিনি শ্রমিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচিত, এবং এআরডি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান মুকুলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। হাবিবুর রহমান মুকুল অনৈতিকভাবে তার স্ত্রীকে প্রগতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি নবম গ্রেডে বেতন দেয়ার অবৈধ অনুমোদন করেছে নিজের প্রভাব কে কাজে লাগিয়ে। অথচ সারা বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকদের কোথাও নবম গ্রেডে বেতন পাওয়ার সুযোগ নেই।
অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁদের প্রভাবের মাধ্যমে পুকুরটি ব্যক্তিগত ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং কোনো লিখিত অনুমোদন বা আর্থিক নথি পাওয়া গেছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে ব্রির বর্তমান মহাপরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলামের দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম, কাজ বণ্টন, টেন্ডার ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এই আলমগীর - মুকুল গংদের প্রভাবশালী ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসনিক নথি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পর্যালোচনা জরুরি।
সরকারি সম্পত্তির আয় কোথায় যাচ্ছে?
সরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নীতিমালা, স্বচ্ছতা ও আর্থিক হিসাব সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। পুকুরটি যদি গবেষণা ও পানি সংরক্ষণের জন্য নির্ধারিত হয়ে থাকে, তাহলে লিজ বা টিকিটের মাধ্যমে মাছ ধরার অনুমতি দেওয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো তদন্তের দাবি রাখে—
- পুকুর লিজ বা মাছ ধরার টিকিট বিক্রির কোনো লিখিত অনুমোদন রয়েছে কি না।
- দুই লাখ টাকা লিজের অভিযোগ এবং জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা আদায়ের বিষয়টির প্রকৃত হিসাব কী।
- আদায়কৃত অর্থ সরকারি কোষাগার, ক্লাবের ব্যাংক হিসাব বা অন্য কোনো হিসাবে জমা হয়েছে কি না।
- পুকুরের ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও শ্রমিক নেতার ভূমিকা কী ছিল।
- ২০০৯ সালে শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ঘটনার প্রকৃত কারণ কী ছিল।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
ব্রির মতো একটি জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সরকারি সম্পত্তি নিয়ে এমন অভিযোগ উদ্বেগজনক। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ব্রি প্রশাসন, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা ও তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
পুকুরের লিজ, মাছ ধরার টিকিট বিক্রি, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ প্রকাশের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি সম্পত্তি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত আয়ের উৎস হতে পারে না। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্টদের অবস্থান পরিষ্কার করা জরুরি।





